মাস্কনে: যা জানা দরকার ও জরুরী

সৌন্দর্যের একটা বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে আমাদের ত্বক। উজ্জ্বল, মসৃণ, সতেজ, পরিষ্কার, এবং সর্বোপরি ব্রণ মুক্ত ত্বক হচ্ছে সৌন্দর্য্যের আসল সংজ্ঞা। কিন্তু, রুপ বা সৌন্দর্য্যের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় ব্রণ, পিম্পল কিংবা একনে। শুধু ব্রণই শেষ না, ব্রণ শেষে ত্বকে ফেলে যায় বিশ্রি রকমের স্পট।  ঠিক যেন সাদা কাপড়ে এক ফোটা কালো দাগের মত। মুখমণ্ডলের এক কোণায় হোক কিংবা পুরোটা জুড়েই, ব্রণ মানেই একরাশ মন খারাপ। 

বিষাক্ত বাতাস আর ধুলোকণায় ছেয়ে থাকা এই পরিবেশে নিজেকে সুন্দর রাখা যেন একটা ভয়াভয় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে এখন। এমন এক ক্রান্তিলগ্নে নতুন করে যোগ হয়েছে করোনার ভয়াবহ থাবা। আত্নরক্ষায় বাধ্য হয়েই মুখে মাস্ক এঁটে দেয়াটা এখন নতুন প্রজন্মের কাছে রীতিমত দুর্বিষহ একটা ব্যাপার। তার উপর সেই মাস্ক যদি হয় ব্রণ কিংবা পিম্পলের কারণ তাহলে এর পরিণাম কতটা মারাত্নক হতে পারে তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। 

মাস্ক পরিধানের কারণে যে একনে বা ব্রণ  বা পিম্পলস হয় তাকেই মাস্ক একনে বা মাস্কনে বলা হয়। করোনার এই ভয়াবহ সময়ে তাহলে কি একনের হাত থেকে বাঁচতে মাস্ক পরা ছাড়তে হবে? নাকি এটি প্রতিরোধের অন্য কোনো ব্যবস্থাও রয়েছে? অবশ্যই ব্যবস্থা আছে। আর সেসব নিয়েই আজকের ব্লগ। চলুন জেনে নেই। 

ব্রণ বা পিম্পল হয় কেন? 

১. আমাদের ত্বকের নিচে সিবেসিয়াস গ্রন্থি নামক এক ধরনের গ্রন্থি থাকে, যার কাজ হচ্ছে ত্বকের ছিদ্র দিয়ে তৈলাক্ত পদার্থ বাইরে নিঃস্বরন করা। কিন্ত কোন কারনে যদি এই গ্রন্থির নালী মুখ আংশিক কিংবা পুরোপুরিভাবে বন্ধ হয়ে যায় তাহলে নিঃসৃত সিবাম বা তেল বাইরে বের হতে না পেরে ভেতরে আটকে জমে ফুল ওঠে। এই ফোলা ভাবটাই হচ্ছে ব্রণ বা পিম্পল। 

২. স্বাভাবিকভাবেই আমাদের ত্বকে উপকারী এবং অপকারী ব্যাকটেরিয়া বাস করে। প্রতিদিন আমাদের ত্বকে জমে থাকা ময়লা, তেল, ঘামই হচ্ছে ব্যকটেরিয়ার খাবার। তাই ত্বক অপরিষ্কার রাখলে কিংবা অতিরিক্ত ঘাম থেকে ত্বকে ব্রণের প্রবনতা বৃদ্ধি পায়। 

৩. ত্বকে ব্যবহৃত নানা ধরনের বিউটি কেমিক্যালের প্রভাবেও ব্রণের সংক্রমণ বৃদ্ধি পায়। আবার, এলার্জি থেকেও আমাদের স্কিনে ব্রণ, একনে র‍্যাশের মত সমস্যা দেখা দিতে পারে। 

৪. সবশেষে বর্তমান সময়ের সবচাইতে এলার্মিং পয়েন্ট হচ্ছে কোভিড ১৯ থেকে সুরক্ষার জন্য ব্যবহৃত মাস্কে ব্রণের সংক্রমণ। 

কোভিড মাস্ক কি? 

কোভিড মাস্ক হচ্ছে কোভিড ভাইরাস এর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য বিশেষভাবে তৈরি ফেস মাস্ক। 

এই মাস্কটি কয়েকটি লেয়ারে এমনভাবে তৈরি যাতে ন্যুনতম বাতাসের কণা, ভাইরাস কিংবা ব্যকটেরিয়া জাতীয় কোনো কিছুই বাইরে থেকে ভেতরে কিংবা ভেতর থেকে বাইরে যেতে না পারে। 

মাস্ক ব্যবহারে ব্রণের সম্ভাবনা কতটুকু এবং কিভাবে?

সাধারনত বিভিন্ন ধরনের কোভিড মাস্ক বাজারে থাকলেও সহজলভ্য হওয়ায় সার্জিক্যাল মাস্কের প্রচলন তুলনামুলকভাবে সবচাইতে বেশি। এই সার্জিক্যাল মাস্কে রাসায়নিক উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয় – 

১. ফলমাল্ডিহাইড  এবং ফ্রাগন্যান্স বা সুগন্ধি:  এলার্জিক স্কিনের জন্য এই দুটি উপাদান এক রকমের শত্রু বলা যায়। যাদের এলার্জির সমস্যা আছে তারা সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করলে স্কিনে এলার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যার ফলে স্কিনে ব্রণের সংক্রমণ সহজেই বেড়ে যায়। 

২. পলিস্টাইরিন এবং পলিকার্বনেট:  অয়েনমেন্ট বা কসমেটিকসে প্রায় সময়ই এই উপাদানটা ব্যবহৃত হলেও এর বিশেষ সাইড ইফেক্ট হচ্ছে এটি আমাদের স্কিনের বেরিয়ারকে পাতলা করে দেয়, লালচে ভাব নিয়ে আসে এবং চুলকানি র‍্যাশের মত সমস্যাও দেখা দিতে পারে। 

এছাড়া, কিছু মাস্কের ভেতরের অংশে সিনথেটিক ফাইবার ব্যবহার করা হয় যা থেকেও এলার্জিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। 

মাস্ক পরিধানে ব্রণ হওয়ার কিছু ভৌত কারন:

১. মাস্ক পরিধানরত অবস্থায় আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে নির্গত ধুলিকণা, ময়লা, জীবাণু বাইরে বের হতে না পেরে মাস্কের ভেতরে আমাদের ত্বকের সাথে আটকে যায়।  এই ময়লা, ধুলিকণা ত্বকের ছিদ্র বন্ধ করে ব্রণের সৃষ্টি করে। 

২. মাস্ক পরিধান করলে বাতাস আটকে আমাদের মুখ ঘেমে যায়। এই ঘাম ত্বকের লোমকুপ বন্ধ করে দেয়, যার ফলে সহজেই ব্রণের সৃষ্টি হয়। 

৩. ত্বকে যত বেশি  তেল, ময়লা আর ঘাম জমা হবে, ত্বকে বসবাসকারী ব্যকটেরিয়াদের খাদ্যের যোগান তত সহজ হবে, তারা বেড়ে ওঠবে তাড়াতাড়ি। এতে ত্বকে ব্রণ সহ অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ার ইনফেকশন হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। 

৪. মেকাপ কিংবা ভারী কসমেটিক্স পন্য ব্যবহার করলে পরে তা  ঘামের সাথে আমাদের ত্বকের ছিদ্র আটকে দেয়। তাছাড়া, অনেক কেমিক্যাল প্রোডাক্ট আছে যা মাস্কের উপাদানের সাথে সাংঘর্ষিক বিক্রিয়া ঘটাতে সক্ষম। এর ফলে ব্রণ এর থেকেও ভয়াবহ ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। 

৫. অনেক সময় ঘামে ভেজা মাস্কের সাথে চুলের কিছু অংশ আমাদের চেহারায় আটকে যায়। যেটা খেয়াল করা হয় না। এতে করে চুলের ময়লা কিংবা খুশকি সহজেই ফেইসের সাথেও আটকে যায়। ফলে ফাংগাল একনি, ফুসকুরির মত সমস্যাও দেখা দেয়। 

মাস্ক একনে কিংবা মাস্ক পরিধানে সৃষ্ট ব্রণ প্রতিরোধে করনীয় কি? 

করোনা মহামারীর এই ভয়াবহ সংক্রমণ থেকে মুক্তির জন্য মাস্ক পড়া আবশ্যক। সৌন্দর্য্যের থেকে জীবনের মুল্য অবশ্যই অনেক বেশি। সুতরাং মাস্ক ব্যবহার বন্ধ করাটা কখনই সমাধান হতে পারেনা। বরং কিছু সাবধানতা অবলম্বন করলে আমরা এই ব্রণের আক্রমণ থেকে মুক্তি পেতে পারি। যেমন –

১. সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহারের পরিবর্তে ১০০% কটন/সুতির নরম কাপড়ের এন্টিসেপ্টিক তিন লেয়ারের মাস্ক ব্যবহার স্কিনের জন্য নিরাপদ।  

২. খুব বেশি আঁটসাঁট ভাবে মাস্ক না পরে ঢিলেঢালাভাবে মাস্ক পরা উচিত। তবে সেক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যেন এতটাও ঢিলেঢালা না হয় যাতে সহজেই জীবাণু ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। 

৩. মাস্ক পরিধানের পূর্বে ভারী মেকআপ কিংবা ক্ষতিকর কেমিক্যাল যুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার করা যাবে না একদম ই। 

৪. ক্লিনজার দিয়ে পরিষ্কার করে মুখ ধুয়ে তারপর মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে যাদের ত্বকে ব্রণের সংক্রমণ বেশি তারা স্যালিসাইলিক এসিড অথবা বেনজয়িক এসিড যুক্ত ক্লিনজার ব্যবহার করতে পারেন। এটি ব্রণ নিয়ন্ত্রণে বেশ ভাল কাজ করে। 

৫. প্রত্যেকবার পরিধানের সময় অবশ্যই পরিষ্কার মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। সার্জিক্যাল মাস্ক সাধারণত ওয়ান-টাইম মাস্ক হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রে প্রত্যেকবার নতুন মাস্ক ব্যবহার সম্ভব না হলে কটনের হাইপোএলার্জেনিক সেইফ লেয়ারযুক্ত মাস্ক ব্যবহার করবেন যেটা ধোয়াও সম্ভব। 

৬. শক্তিশালী কোন সারফেক্টেন্ট এবং অতিরিক্ত সুগন্ধিযুক্ত কিছু দিয়ে মাস্ক পরিষ্কার করা যাবে না। এটি পরবর্তীতে স্কিনের সাথে বিক্রিয়া করে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। মাস্ক ভাল করে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে তারপর ব্যবহার করতে হবে। ভেজা মাস্ক কোন অবস্থাতেই ব্যবহার করা উচিত নয়।

৭. মাস্ক ব্যবহারের পুর্বে ত্বকে ক্ষতিকর কেমিক্যাল মুক্ত, ন্যাচারাল জেল টাইপ ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করা উচিত। এতে ত্বক পর্যাপ্ত হাইড্রেট থাকবে। ঘাম নিঃসরণ কম হবে। ত্বকের অতিরিক্ত তেল শোষণ করবে। খেয়াল রাখবেন, ময়শ্চারাইজারটি যেন অবশ্যই ননকমেডোজেনিক হয়। যা আমাদের ত্বকের ছিদ্র বন্ধ করবে না। 

৮. ত্বকের ঘাম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এন্টি সোয়েটিং লোশন, অয়েনমেন্ট কিংবা সুগন্ধিহীন সেইফ ফেইস পাউডার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই বেশি সময় এটি ত্বকে রাখা যাবে না। ৩-৪ ঘন্টা পর ত্বকে পরিষ্কার করে ধুয়ে পুনরায় আবার লাগাতে হবে।

৯. একটানা খুব বেশি সময় মাস্ক পরিধান করে থাকা উচিত না । ২-৩ ঘন্টা পর পর কোন সেইফ জোনে গিয়ে   কিছুক্ষণ মাস্ক খুলে দীর্ঘ শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া উচিত এবং পরিষ্কার রুমাল কিংবা টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে নেয়া উচিত।  হাতের কাছে পানি থাকলে পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে, মুছে তারপর আবার মাস্ক পরিধান করতে হবে। 

১০. প্রত্যেকবার মাস্ক ব্যবহারের পর ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করতে হবে। সপ্তাহে ১/২ বার প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে ফেইস স্ক্রাব করতে হবে। এতে জমে থাকা ময়লা বের হয়ে আসবে সেই সাথে ত্বকের বন্ধ ছিদ্রগুলিও খুলে যাবে। প্রাকৃতিক উপাদানের পরিবর্তে কেমিক্যাল এক্সফ্লোয়েটও ব্যবহার করা যাবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে সেটা অবশ্যই ননকমেডোজেনিক হয়। 

সোর্স লিংক: 1.How to Prevent and Treat Face Mascne.
02. How to Avoid Maskne (Mask Acne) Breakouts. 
03. Chemical cocktail found in face masks
0 I like it
0 I don't like it

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *